মার্কিন সরবরাহ চেইন প্রসঙ্গে বিশ্লেষকরা

ভারতের এখনই চীনের বিকল্প হয়ে ওঠা সম্ভব নয়

চীন-মার্কিন ভূরাজনৈতিক উত্তেজনায় অন্যতম জ্বালানি হিসেবে কাজ করছে বাণিজ্য বিরোধ।

চীন-মার্কিন ভূরাজনৈতিক উত্তেজনায় অন্যতম জ্বালানি হিসেবে কাজ করছে বাণিজ্য বিরোধ। অতিচর্চিত শুল্কযুদ্ধের আগে থেকেই পণ্য আমদানিতে বেইজিংনির্ভরতা কমিয়ে আনতে সচেষ্ট ওয়াশিংটন। এর অংশ হিসেবে চীন থেকে অনেক মার্কিন কোম্পানি বিকল্প উৎপাদন কেন্দ্রগুলোয় স্থানান্তর হয়েছে, যার অন্যতম ভারত। শুল্কযুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে সৃষ্ট মেরুকরণে ভারত-মার্কিন বাণিজ্য আলোচনায় চীনের বিকল্প পাওয়া গেছে বলে ভাবা হচ্ছে। কিন্তু বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বলছেন, মার্কিন সরবরাহ চেইনের চাহিদা মেটানোর ক্ষেত্রে এখনই ভারতের পক্ষে চীনের বিকল্প হয়ে ওঠা সম্ভব নয়।

সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞদের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা আনাদোলু জানিয়েছে, সরবরাহ চেইনে বৈচিত্র্য আনতে চাইলেও স্বল্পমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যে চীনের বিকল্প হতে পারবে না ভারত। এমনকি ওয়াশিংটন-দিল্লির মধ্যে চুক্তি হলেও বিকল্প সরবরাহ চেইন পুরোপুরি সম্পন্ন হতে সময় লাগবে।

গত জানুয়ারি থেকে ধাপে ধাপে চীন থেকে আমদানি করা পণ্যের ওপর ১৪৫ শতাংশ শুল্ক চাপিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এর প্রতিক্রিয়ায় মার্কিন পণ্যের ওপর ১২৫ শতাংশ শুল্ক কার্যকর করেছে বেইজিং। পরবর্তী সময় ওয়াশিংটন বেশির ভাগ দেশের ওপর থেকে রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ স্থগিত করেছে। কিন্তু অতিপ্রত্যাশিত হলেও যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্যযুদ্ধের কোনো সমাধান চোখে পড়ছে না, এ প্রেক্ষাপটে ভারতের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের মনোযোগ বাড়ছে।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, চীনের ওপর নির্ভরতা কমাতে এবং বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন বৈচিত্র্যপূর্ণ করতে মার্কিন কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগ অন্য দেশে স্থানান্তরের পরিকল্পনা চলছে। এ প্রক্রিয়ায় যে দেশগুলোর সঙ্গে প্রাথমিক পর্যায়ে চুক্তি হতে পারে, সে তালিকায় শীর্ষে রয়েছে ভারত। এতে বিশ্বের বৃহত্তম উৎপাদন কেন্দ্র চীনের বিকল্প হিসেবে ভারতকে সামনে নিয়ে আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

তবে তুরস্কভিত্তিক আর্থিক সংস্থা আইএস ইনভেস্টমেন্টের আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজার বিভাগের ব্যবস্থাপক সান্ত মানুকিয়ান বলেন, ‘স্বল্পমেয়াদে ভারতের পক্ষে চীনের জায়গা নেয়া সম্ভব নয়।’

বেশ কয়েকটি সমস্যা উল্লেখ করে সান্ত মানুকিয়ান বলেন, ‘দক্ষতা, অবকাঠামো ও আইনি কাঠামোর দিক থেকে চীনের বিকল্প হিসেবে স্বল্পমেয়াদে ভারতকে প্রতিষ্ঠা খুব একটা সম্ভব নয়। তবে দীর্ঘমেয়াদে এমন একটি পরিকল্পনা থাকতে পারে।’

অবশ্য আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও রাজনীতির বহুমুখী জটিলতার দিক থেকে ভারত-মার্কিন সম্পর্ককে দেখার পক্ষে সান্ত মানুকিয়ান। তিনি জোর দিয়ে জানান, বিষয়টিকে শুধুই বিকল্প সরবরাহকারী খোঁজার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা উচিত নয়। একে একটি কৌশল হিসেবেও বিবেচনা করা যেতে পারে, ভারত যেন মার্কিন বলয়ের বাইরে যেতে না পারে। বিশেষ করে চীন-রাশিয়া জোট নিয়ে উদ্বিগ্ন যুক্তরাষ্ট্র।

সান্ত মানুকিয়ানের মতে, ভারতকে নিজের দিকে টানতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। যেখানে পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং শীতল যুদ্ধ বা রাশিয়ার ক্ষেত্রে ভারতের নিরপেক্ষ মনোভাবকে ভারসাম্যমূলক অবস্থান হিসেবে দেখা হয়। সঙ্গে যোগ করেন, ‘তবে মোটের ওপর ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক ইতিহাসের কারণে অ্যাংলো-স্যাক্সন সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত ভারত। ফলে ভাষাগত কোনো বাধা নেই। তাই ধরে নেয়া যেতে পারে যুক্তরাষ্ট্র এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে চাইবে।’

প্রযুক্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের বিরোধ দীর্ঘদিনের। এ দিকও বিবেচনা করছেন তুরস্কের বুরসা উলুদাগ ইউনিভার্সিটির অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ফিলিজ এরইলমাজ। তার মতে, চীনকে যেকোনোভাবে থামানো যুক্তরাষ্ট্রের চূড়ান্ত লক্ষ্য হতে পারে। কারণ দেশটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে এবং এ অগ্রগতি রোধ করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র।

তিনি বলেন, ‘হোয়াইট হাউজ যেসব দেশে শুল্কে ছাড় দিয়েছে তা থেকেই বিষয়টি বোঝা যায়। বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্র চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে মন্থর করতে কাজ করছে এবং ভারত সে শূন্য জায়গা পূরণে চেষ্টা করবে। তবে স্বল্পমেয়াদে ভারতের পক্ষে চীনের বাজার পূরণ করা সম্ভব নয়।’

ফিলিজ এরইলমাজ বলেন, ‘ভারতের পক্ষে টেক্সটাইল, অটোমোটিভ ও সহায়ক শিল্প খাতে চীনের বিকল্প হতে গেলে বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। এটি ভারতের জন্য ইতিবাচক হলেও স্বল্পমেয়াদে দেশটি চীনের স্থান পূরণ করতে পারবে না।’

ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচনে বিজয়ের পর প্রথম দিকে অভিনন্দন জানানো বিশ্বনেতাদের অন্যতম নরেন্দ্র মোদি। কিন্তু হোয়াইট হাউজে প্রবেশের পর একাধিকবার ভারতের শুল্কনীতির কঠোর সমালোচনা করেছেন ট্রাম্প। দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ে সমালোচনার পাশাপাশি ভারতকে ‘শুল্কের রাজা’ ও ‘শুল্কের মাধ্যমে শোষণকারী’ বলে অভিহিত করেন তিনি। এ সময় আগাম প্রস্তুতি হিসেবে একাধিক মার্কিন পণ্যের ওপর থেকে বড় অংকের শুল্কছাড়ের ঘোষণা দেয় ভারত। এরপর গত মাসে বিশ্বের বেশির ভাগ দেশের ওপর রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ কার্যকর হয়। যা অল্প সময়ের মধ্যে অন্য অনেক দেশের মতো ভারতীয় পণ্যেও সাময়িকভাবে স্থগিত হয়। তবে এর আগে থেকেই বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে তোড়জোর চলছিল।

ভারত-যুক্তরাষ্ট্র দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি আলোচনায় সম্প্রতি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। শরতের মধ্যে দেশ দুটি দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি বিটিএ সম্পন্ন করার লক্ষ্যে কাজ করছে। এ চুক্তির মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ৫০ হাজার কোটি ডলারে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

পরিসংখ্যান অনুসারে, গত বছর ভারত থেকে ৮ হাজার ৭৪০ কোটি ডলার মূল্যের পণ্য আমদানি করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ৪ হাজার ১৭০ কোটি ডলারের পণ্য রফতানি করেছিল ভারতে। এতে ৪ হাজার ৫৭০ কোটি ডলার বাণিজ্য ঘাটতিতে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ২০২৩ সালে এ ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ৩৬৫ কোটি ডলার।

আরও